রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার ময়েনপুর ইউনিয়নের ফুলচৌকি গ্রামে আজও ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও কৃষক সংগ্রামের অন্যতম নেতা শহীদ নবাব নূরলদীন এখানেই শায়িত রয়েছেন। যাঁর আসল নাম ছিল নূরউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং।
ফুলচৌকি মসজিদের প্রধান ফটকের সামনে তাঁর সমাধি যেন আজও স্বাধীনতার সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করছে। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এটি প্রতিরোধ, সাহস এবং আত্মত্যাগের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন।
তিন গম্বুজের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ
ফুলচৌকিতে প্রায় ১৭ শতক জমির ওপর নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট দুই কাতার সম্বলিত একটি প্রাচীন মসজিদ আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, মসজিদটি নির্মিত হয় ১২২০ বঙ্গাব্দের ২৫ ভাদ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই মসজিদ নবাব নূরলদীনের বীরত্বগাথা প্রচার করে চলেছে।
সমাধিস্থলে শহীদ নবাব নূরলদীন
মসজিদের সামনের দিকে প্রায় ২৮ শতক জমির ওপর একটি ছোট কবরস্থান রয়েছে। এখানেই শায়িত আছেন শহীদ নবাব নূরউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং। ইতিহাস অনুযায়ী, তিনি ছিলেন দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের আপন চাচাতো ভাই ও ভগ্নিপতি।
রাজপরিবারের সদস্য হয়েও তিনি বাংলার কৃষক সমাজের অধিকার ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর আত্মত্যাগ আজও এ অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
বসতভিটার শেষ চিহ্ন ধ্বংসপ্রায় দেয়াল
ফুলচৌকি মসজিদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ধ্বংসপ্রায় ইটের দেয়াল। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এটিই ছিল নবাব নূরলদীনের বসতভিটার শেষ চিহ্ন। সময়ের নির্মম আঘাতে বাড়ির কাঠামো হারিয়ে গেলেও দেয়ালটি যেন ইতিহাসের নীরব দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ফুলচৌকির এই ঐতিহাসিক মসজিদ ও নবাব নূরলদীনের সমাধিস্থল জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগ না থাকলে এই গৌরবময় ইতিহাস ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফুলচৌকি আজও মনে করিয়ে দেয়—বাংলার স্বাধীনতা ও কৃষক আন্দোলনের পথচলায় অনেক বীর নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের স্মৃতি আজও ছড়িয়ে আছে গ্রামের মসজিদ, কবরস্থান আর ধ্বংসপ্রায় দেয়ালের মাঝে।