০৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কে এই ভেনেজুয়েলার ‘মীরজাফর’?

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৪৯:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬২ Time View

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক অভিযানে চলতি মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হলে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়। দুর্গসদৃশ নিরাপত্তায় ঘেরা সরকারি বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে তুলে নেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো—এ নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল যে ভেতরের কারও সহায়তা ছাড়া এমন অভিযান বাস্তবায়ন কঠিন।

পরবর্তীতে রয়টার্স জানায়, মাদুরোর খুব কাছের এক ব্যক্তি নিয়মিত তার অবস্থান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে সরবরাহ করছিলেন। এর ফলে অভিযানের আগেই যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত ধারণা পায়। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, ফলে জল্পনা আরও বাড়ে।

 

এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় রয়টার্সের আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, মাদুরোকে গ্রেপ্তারের কয়েক মাস আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এমনকি অভিযানের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোকে সতর্ক করে বলেছিল যেন তার নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের দিয়ে বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো না হয়। কাবেলোর অধীনে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে, যা মাদুরো অপসারণের পরও প্রায় অপরিবর্তিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, যে মাদক পাচার মামলায় মাদুরোকে আটক করা হয়েছে, সেই একই মামলায় কাবেলোর নামও রয়েছে। তা সত্ত্বেও অভিযানের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই কাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং মাদুরো অপসারণের ঠিক আগের সময়েও এই আলোচনা চলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেলোর ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, কাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয় করেন, তাহলে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাবেলোর আলোচনায় ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কাবেলো প্রকাশ্যে রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও বাস্তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরে কাবেলোকে দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ এই সহযোগী পরবর্তীতে মাদুরোর শাসনামলে দমননীতির প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত হন। সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তার প্রভাব রয়েছে এবং সরকারপন্থি সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘কোলেকতিভো’দের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। ২০২০ সালে তাকে একটি বড় মাদক পাচার চক্রের শীর্ষ নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করে তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়। যদিও তিনি এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

মাদুরো অপসারণের পর মার্কিন রাজনীতিতেও প্রশ্ন ওঠে—কাবেলোকে কেন আটক করা হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি মাদুরোর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারেন। যদিও কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নিরাপত্তা তল্লাশি কিছুটা কমেছে এবং রাজনৈতিক বন্দিমুক্তির ঘোষণা এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর মতো প্রভাবশালী নেতাদের ওপর নির্ভর করছে। তবে তার অতীত ভূমিকা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ কলেজসমূহের অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে ঢাকায় মহানগর ল কলেজের মানববন্ধন

কে এই ভেনেজুয়েলার ‘মীরজাফর’?

Update Time : ০৫:৪৯:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক অভিযানে চলতি মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হলে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়। দুর্গসদৃশ নিরাপত্তায় ঘেরা সরকারি বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে তুলে নেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো—এ নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল যে ভেতরের কারও সহায়তা ছাড়া এমন অভিযান বাস্তবায়ন কঠিন।

পরবর্তীতে রয়টার্স জানায়, মাদুরোর খুব কাছের এক ব্যক্তি নিয়মিত তার অবস্থান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে সরবরাহ করছিলেন। এর ফলে অভিযানের আগেই যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত ধারণা পায়। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, ফলে জল্পনা আরও বাড়ে।

 

এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় রয়টার্সের আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, মাদুরোকে গ্রেপ্তারের কয়েক মাস আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এমনকি অভিযানের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোকে সতর্ক করে বলেছিল যেন তার নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের দিয়ে বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো না হয়। কাবেলোর অধীনে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে, যা মাদুরো অপসারণের পরও প্রায় অপরিবর্তিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, যে মাদক পাচার মামলায় মাদুরোকে আটক করা হয়েছে, সেই একই মামলায় কাবেলোর নামও রয়েছে। তা সত্ত্বেও অভিযানের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই কাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং মাদুরো অপসারণের ঠিক আগের সময়েও এই আলোচনা চলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেলোর ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, কাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয় করেন, তাহলে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাবেলোর আলোচনায় ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কাবেলো প্রকাশ্যে রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও বাস্তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরে কাবেলোকে দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ এই সহযোগী পরবর্তীতে মাদুরোর শাসনামলে দমননীতির প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত হন। সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তার প্রভাব রয়েছে এবং সরকারপন্থি সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘কোলেকতিভো’দের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। ২০২০ সালে তাকে একটি বড় মাদক পাচার চক্রের শীর্ষ নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করে তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়। যদিও তিনি এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

মাদুরো অপসারণের পর মার্কিন রাজনীতিতেও প্রশ্ন ওঠে—কাবেলোকে কেন আটক করা হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি মাদুরোর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারেন। যদিও কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নিরাপত্তা তল্লাশি কিছুটা কমেছে এবং রাজনৈতিক বন্দিমুক্তির ঘোষণা এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর মতো প্রভাবশালী নেতাদের ওপর নির্ভর করছে। তবে তার অতীত ভূমিকা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলা